গোদাগাড়ী (রাজশাহী ) থেকে মোঃ হায়দার আলীঃ রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে ৩ মাস সেলাই প্রশিক্ষন শেষে ৩০ প্রশিক্ষার্থীদের মাঝে সিঙ্গার কোম্পানির সেলাই মেশিন প্রদান করা হয়েছে। সোমাবার সকাল সাড়ে ১০ টার সময় উপজেলা পরিষদের পুরাতন অডিটারিয়ামে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ নাজমুস সাদাত রত্নের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ শামসুল ইসলাম, মাষ্টার ট্রেনার শাহানারা বিশ্বাস শাহিনুর, কোর্স কডিনেটর আতিকুর রহমান প্রমূখ।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ নাজমুস সাদাত রত্ন জানান, উচ্চতর দক্ষতা সম্পূর্ণ সেলাই প্রশিক্ষণ শেষে ৩০ জনকে জেলা প্রশাসক স্যারের মাধ্যমে আজকে সেলাই মেশিন প্রদান করা হয়েছে।। কিছুদিনের মধ্যে দ্বিতীয় ব্যাচ শুরু হবে। মাষ্টার ট্রেনার শাহানারা বিশ্বাস শাহিনুর খুবই দক্ষ, খুব সহজে ভালভাবে শিখিয়াছেন।
জেলা প্রশাসক আফিয়া আখতার বলেন, যারা সেলাই মেশিন পেল তাদের সবাইকে স্বাবলম্বী হতে হবে। এ মেশিন বিক্রি করা যাবে না।
পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরকেও এগিয়ে যেতে হবে। নিজে কিছু করার জন্য আগে প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষতা বাড়াতে হবে। এজন্য সেলাই প্রশিক্ষণ খুবই গুরুত্বপর্ণ। সেলাই প্রশিক্ষণ নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখে। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার মাধ্যমে নারীরা সমাজে নিজেদের একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে। সেলাই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীরা নতুন দক্ষতা অর্জন করতে পারে এবং নিজেদের জন্য একটি স্থায়ী আয়ের পথ তৈরি করতে হবে । এধরনের নিয়ে অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছেন। যা দেশের অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখছে। বেকার যুবক ও নারীদের স্বাবলম্বী করতে সেলাই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় ব্যাচ শুরু করার জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে নির্দেশনা দেন।
মাষ্টার ট্রেনার শাহানারা বিশ্বাস শাহিনুর বলেন, যারা কাজ শিখছেন তারা খুব আন্তরিক, মনোযোগ সহকারে প্রশিক্ষণ গ্রহন করছেন। সেলাই প্রশিক্ষণ ভবিষ্যতে অনেকভাবে উপকারী আসতে পারে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা নিজস্ব দক্ষতা ব্যবহার করে একদিকে যেমন আয় করতে পারেন অন্যদিকে তেমনী দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবেন। কেন না অন লাইন মার্কেটিং করে বিদেশে তৈরীপুন্য রপ্তানী করতে পারবেন। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির যুগে সেলাই ও ড্রেস মেকিং এর মতো ক্ষেত্রে বিভিন্ন কাজ রয়েছে যেমন বাড়িতে দর্জির কাজ, দোকানে পোশাক তৈরি করা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়। কম বিনিয়োগ সেলাই মেশিন কিনে একটি ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করা সম্ভব যা পরিবারের আয়ের উৎস হতে পারে।
তিনি আরও বলেন সেলাই প্রশিক্ষনের মাধ্যমে নতুন ডিজাইন তৈরি এবং পোশাকের ক্ষেত্রে সৃজনশীলতা বাড়ানো যায়। আধুনিক বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে নিজের এবং পরিবারের পোশাক তৈরির সাথে সাথে নিজকে উপস্থাপন করা যায়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং উপকারী দক্ষতা।
নিজের মেধা, দক্ষতা কলা-কৌশল কাজে লাগিয়ে যুগোপযোগী, সৃজনশীলতা, রুচিশীল, চাহিদা সম্পন্ন, উন্নত মানসম্পূর্ন্ন পোশাক তৈরী করা যায়।
দক্ষ সেলাই জানলে ভবিষ্যতে নিজস্ব বুটিকস বা ফ্যাশন ডিজাইনিং এর উদ্যোগ শুরু করার পথ খুলে যেতে পারে। আধুনিক বিশ্বে ফ্যাশান ও পোশাকের চাহিদা সবসময় থাকে তাই সেলাই চাহিদা ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাবে ইনসাল্লাহ।
গৃহবধূ ও প্রশিক্ষনার্থী মোসাঃ জোহরুন নেসা বলেন, উদ্যোক্তা হওয়ার জন্যই কাজ শিখতে এসেছি। আমাদের মাষ্টার ট্রেনার শাহানারা বিশ্বাস শাহিনুর ম্যাডাম খুব ভাল মনের মানুষ, আমি সেলাইয়ের কোন কিছু জানতাম না। অনেক কিছু শিখেছি। ম্যাডাম আমাদেরকে একটি কাজ ৫/৭ বার পর্যন্ত হাতে কলমে, সহজ উপায়ে শিখিয়ে দিয়েছেন। আমরা বুঝতে না পারলে ম্যাডামের নিকট ছুটে যায়। কেউ ডাকলে ম্যাডামও চলে এসে একধিকবার করে বুঝিয়ে দেন, কোন বিরক্ত বোধ করেন না। একই মন্তব্য করেন প্রশিক্ষার্থী, প্রতিবন্ধী নেত্রী ঝর্ণা।
বিধবা সুরভী বলেন, দেড় বছর আগে স্বামী মারা গেছেন, দুইটি ছেলে নিয়ে কষ্ট করে সংসার চালাই। বড় ছেলে ১০ বছর ছোট ছেলেটি ১৮ মাসের। ২ ছেলেকে শাশুড়ী নিকট রেখে এসে সেলাই প্রশিক্ষন অংশ গ্রহন করেছিলাম । সংসার চালাতে হিমসিম খাই। প্রশিক্ষন শেষে সেলাই মেশিন পেয়ে আমি দারুন খুশি। কিছু ইনকাম করতে পারবো ইসসাল্লাহ।
প্রতিবন্ধী কামরুল ইসলাম বলেন, আমি কাজ জানি, কিন্তু শিখার শেষ নেই। তাই তো উচ্চতর সেলাই প্রশিক্ষণে অংশ গ্রহন করেছিলাম। মেশিন পেয়ে সবাই দারুন খুশি।
কোর্স পরিচালক আতিকুর রহমান আতিক বলেন,সমাজের অসহায় শিক্ষার্থী ও নারীদের হাতে-কলমে সেলাই প্রশিক্ষণের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল এ প্রশিক্ষণে। তিন মাস প্রশিক্ষণ শেষে মেশিন পেয়ে সবাই ইদের মত আনন্দ করছেন। সাবেক ইউএনও ফয়সাল আহমেদ সেলাই মেশিন প্রদান ও মিনি গামেন্টস করার কথা বলেছিলেন। আজ একটি দাবী পূরণ হওয়ায় সাবাই খুশি হয়েছেন। আগামীতে দ্বিতীয় ব্যাচ শুরু হবে ইনসাল্লাহ।
প্রশিক্ষার্থী কুলসুম বেওয়া জানান, স্বামী ঢাকায় কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনা মারা গেছেন। ১ ছেলে ও ১ মেয়ে কষ্ট করে হাঁস – মুরগী পুষে ( পালন করে) ডিম বিক্রি করে সংসার চালাই। বাড়ীতে সেলাই মেশিন নেই। কেনার সামর্থ নেই। মাষ্টার ট্রেনার শাহানারা বিশ্বাস শাহিনুর ম্যাডাম যে কাজ দেন সেই কাজ সুঁই সুতা ব্যবহার করে জমা দিয়েছিলাম। আজ ভাল লাগছে সেলাই মেশিন পেয়ে। প্রশিক্ষনের অভিজ্ঞতাকে কাজ লাগিয়ে ইনকাম করতে করে ছেলে মেয়ের মুখে হাসি ফোঁটাতে পারব ইনসাল্লাহ।
এ প্রশিক্ষণে প্রথম ব্যাচে অংশ গ্রহন করছেন ৩৫ জন গরীব, দুস্থ্য, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা, প্রতিবন্ধী, স্বচ্ছল অবস্থাশালী পরিবারের বেকার নারী, পুরুষ, যুবক, যুবতীরা অংশ গ্রহন করেন। নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষন সম্পূন্ন করেন ৩০ জন। এতে প্রথম স্থান অধিকার করেন, গৃহবধূ মোসাঃ জোহরুন নেসা, দ্বিতীয় স্থান মোসাঃ অধিকার করেন মেহেরুন বেওয়া, তৃতীয় স্থান অধিকার করেন কুলসুম বেওয়া। প্রথমে এ ৩জন কে সেলাই দেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু এ তিন জন্য সেলাই মেশিন না নিয়ে সবাই সাবাই দেয়ার আহ্বান জানান।
পরবর্তী মাষ্টার ট্রেনার শাহানারা বিশ্বাস শাহিনুর, বিভিন্ন সময়ে সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফয়সাল আহম্মেদ ও বর্তমান উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ নাজমুস সাদাত রত্নের সাথে দেখা করে সাবাইকে সেলাই মেশিন দেয়ার দাবী জানান। কয়েকজন প্রশিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে নতুন ইউএনও স্যারের সাথে দেখা সবাইকে সেলাই মেশিন দেয়ার জোর দাবী জানান এবং সবাইকে মেশিন দেয়ার ব্যবস্থা করেন।
প্রশিক্ষণ শেষে তাদের চোখে, মুখে স্বপ্ন একটি মিনি গার্মেন্টস এর মালিক হওয়া, উদ্যোক্তা হওয়া, নিজের পরিবারের কাজগুলি করা, আশেপাশের মানুষের কাজ করে কিছু ইনকাম করে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনা, সুখে শান্তিতে বসবাস করাসহ স্বাবলম্বী হওয়া।
মোঃ হায়দার আলী
গোদাগাড়ী,রাজশাহী।