মোঃ বাবুল হোসেন , পঞ্চগড়:
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলায় পঞ্চমবারের মতো ফুটেছে ভিনদেশি রাজসিক ফুল টিউলিপ। ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা দর্জিপাড়া এলাকায় রঙিন এই ফুলের বাগান ছড়িয়ে দিচ্ছে মুগ্ধতা। প্রতিদিনই বিভিন্ন জেলা থেকে দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন বাগানে। টিউলিপের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি স্থানীয় কৃষক-কৃষাণীরাও হচ্ছেন আর্থিকভাবে লাভবান।
এবারও শীতপ্রধান দেশের এই ফুলের চাষের উদ্যোগ নিয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)। ১০ জন নারী উদ্যোক্তার মাধ্যমে ৬০ শতক জমিতে খামারভিত্তিক টিউলিপ বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। প্রায় ১৪ হাজার ফুলে সাজানো হয়েছে পুরো বাগান। সূর্যের আলো ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বসানো হয়েছে বিশেষ শেড। বাইরে রঙিন পতাকায় তৈরি করা হয়েছে নান্দনিক প্রবেশপথ।
বাগানজুড়ে ফুটে আছে লালিবেলা (লাল), ডেনমার্ক, স্ট্রং গোল্ড, মিস্টিক ভ্যান ইজক (গোলাপি)সহ পাঁচ রঙের টিউলিপ। জনপ্রতি ৫০ টাকা টিকিট কেটে দর্শনার্থীরা বাগানে প্রবেশ করছেন। কেউ ফুল ছুঁয়ে দেখছেন, কেউ ছবি তুলছেন, কেউবা সেলফিতে বন্দি করছেন রঙিন মুহূর্ত। শিশুদের কোলাহল আর পর্যটকদের উচ্ছ্বাসে মুখর পুরো এলাকা।
গত চার বছর ধরে দর্জিপাড়া এলাকার কৃষক-কৃষাণীরা টিউলিপ চাষ করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। নারী উদ্যোক্তাদের এই উদ্যোগ স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ইএসডিও জানায়, ক্ষুদ্র চাষিদের স্বাবলম্বী করা, পারিবারিক আয় বৃদ্ধি, বিদেশ থেকে টিউলিপ আমদানি কমানো এবং পঞ্চগড়কে পর্যটনবান্ধব জেলা হিসেবে গড়ে তোলাই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি ইকো-কমিউনিটি ট্যুরিজমের সম্ভাবনাও জোরদার হচ্ছে।
২০২২ সালে পাইলট প্রকল্প হিসেবে শারিয়ালজোত ও দর্জিপাড়া গ্রামে আটজন নারী উদ্যোক্তার মাধ্যমে ৪০ শতাংশ জমিতে ৬ প্রজাতির ৪০ হাজার টিউলিপ চাষ শুরু হয়। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এবারও প্রসারিত হয়েছে চাষের পরিধি।
টিউলিপ সাধারণত শীতপ্রধান দেশে দেখা যায়। চাষের জন্য দিনের বেলা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাতে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উপযোগী। রোপণের ১৮ থেকে ২০ দিনের মধ্যে কলি আসে এবং ২৫ থেকে ৬০ দিন পর্যন্ত ফুল স্থায়ী হতে পারে। তবে আবহাওয়ার তারতম্যে ফলনে পরিবর্তন হতে পারে।
কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, আমাদের এখানে টিউলিপের একটি বাল্ব নেদারল্যান্ড থেকে আনতে প্রায় ৮০ টাকা খরচ পড়ে। প্রতি বছরই নতুন করে বাল্ব আমদানি করতে হয়। দর্শনার্থীদের টিকিট বিক্রি ও ফুলের স্টিক বিক্রির মাধ্যমে আয় হয়। ঢাকায়ও ফুল পাঠানো হচ্ছে।
তিনি জানান, প্রতিটি স্টিক ১০০ টাকায় বিক্রি করা হয়। ১০ জন কৃষক এই চাষে যুক্ত আছেন। ইএসডিও তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে-কীভাবে লাগাতে হবে, কীভাবে পরিচর্যা করতে হবে-সবকিছুই শিখিয়েছেন প্রশিক্ষকেরা।
নীলফামারী থেকে আসা প্রভাষক আব্দুল হামিদ বলেন, শুনেছিলাম টিউলিপ খুব সুন্দর। আজ এসে দেখে সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি।
শিক্ষার্থী সারিশ মুশফিয়াত শ্রেষ্ঠা বলেন, টিভি আর মোবাইলে দেখেছি, কিন্তু সামনে থেকে কখনো দেখিনি। দেখে একেবারে ছবির মতো লাগছে।
ইএসডিওর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মুহম্মদ শহীদ উজ জামান বলেন, পাঁচ বছর আগে প্রান্তিক নারীদের নিয়ে টিউলিপ চাষ শুরু করি। এখন এটি তেঁতুলিয়ায় পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আয় ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এখানে ইকো-কমিউনিটি ট্যুরিজম গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

Leave a Reply