মোঃ বাবুল হোসেন পঞ্চগড় প্রতিনিধি :
পঞ্চগড়েররবোদা উপজেলার মাড়েয়া আউলিয়া ঘাটে করতোয়া নদীর ওপর নির্মাণাধীন ১১০ কোটি টাকার মেগা সেতু প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের মেয়াদ প্রায় শেষ হলেও এখনো বাকি অর্ধেকের বেশি কাজ। আর এই তড়িঘড়ি করে কাজ শেষ করতে গিয়ে পাথরের বদলে পুরনো কংক্রিট ভেঙে ব্যবহারের মতো গুরুতর অনিয়ম করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যাবহারের ফলে সেতুর স্হায়িত্ব নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম সংশয়। এদিকে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও এলজিইডি একে অপরের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছে।
২০২২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বোদা উপজেলার মাড়েয়া আউলিয়া ঘাটে ভয়াবহ নৌকাডুবিতে নারী ও শিশু সহ ৭২ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। সেই শোকাবহ ঘটনার পর জোড়ালো ভাবে এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি মেটাতে ২০২৩ সালে ১১০ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আউলিয়া ঘাট -কালিয়াগঞ্জ রুটে ৩৪৫ মিটার এবং মাড়েয়া- বড়শশী রুটে ৫৪৫ মিটার দীর্ঘ এই সেতু দুইটির কাজ পায় ‘ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইন্জিনিয়ারিং লিমিটেড (এনডিই) নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
প্রকল্পের নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে কাজ শেষ হবার কথা থাকলেও। কিন্তু বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও এলজিইডির তথ্য মতে এ পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি মাত্র ৬২ শতাংশ। কাজের শুরুর দিকে বন বিভাগ এবং পরে আবার ব্যাক্তি মালিকানা ভূমি অধিগ্রহণসহ নানা জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় এখনো দুই ধারের হাজার হাজার মানুষ শুস্ক মৌসুমে বাঁশের সাঁকো আর বর্ষায় ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় নদী পারাপার হচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আফরোজা বলেন, “বর্ষায় রোগী নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নদীর পাড়ে বসে থাকতে হয়। আমাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার এই ব্রিজটি দ্রুত হওয়া খুব দরকার।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে বর্ধিত মেয়াদে কাজ দ্রুত শেষ করতে দিন-রাত কাজ চলছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, স্লোপ প্রটেকশন ও কাস্টিংয়ের কাজে নতুন পাথরের বদলে আগে ব্যবহৃত পাইলিংয়ের হেড মেশিনে ক্রাশ করে ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া গার্ডারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশে ব্যবহৃত ব্ল্যাকস্টোনের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। এলাকাবাসী সারওয়ার হোসেন ও সোলেমান হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “চোখের সামনে পাইলিংয়ের মাথা ভেঙে সেই পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে, দেখার কেউ নেই। এভাবে কাজ হলে এই ব্রিজ টিকবে তো?
অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনডিই-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী হাসনাত কবীর দাবি করেন, তারা যা করছেন তা স্থানীয় এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলীর সম্মতিতেই করছেন। তবে এলজিইডি পঞ্চগড়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ জামান বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, প্রকল্পে পুরনো মালামাল (রি-ইউজ ম্যাটেরিয়ালস) ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। যদি এমন কিছু করা হয়, তবে তা গ্রহণ করা হবে না।
এ বিষয়ে পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক কাজী সায়েমুজ্জামান বলেন, “এত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্পে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অসঙ্গতি মেনে নেওয়া হবে না। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে।”
যে করতোয়া নদীতে স্বজন হারিয়েছেন পঞ্চগড়বাসী, সেই নদীর ওপর স্বপ্নের সেতুটি যেন দুর্নীতির কারণে নতুন কোনো ‘মৃত্যু ফাঁদে’ পরিণত না হয়—এমনটাই এখন বোদা ও মাড়েয়া উপজেলার হাজারো মানুষের আকুতি।

Leave a Reply