শহিদুল ইসলাম।।
মহেশপুর (ঝিনাইদহ) সংবাদদাতাঃ-
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অতি গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভোট কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেয় নির্বাচন কমিশন। এর অংশ হিসেবে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলায় মোট ১১২টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ৬৯টি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়।
তবে অভিযোগ উঠেছে, বাকি ৪৩টি ভোট কেন্দ্রে কোনো সরকারি বরাদ্দ ছাড়াই স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের ব্যক্তিগত অর্থে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করিয়েছেন ইউএনও খাদিজা আক্তার। এ ঘটনায় ইউএনও’র বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন একাধিক শিক্ষক।
ভুক্তভোগী শিক্ষকদের অভিযোগ, প্রতি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা ও সংশ্লিষ্ট ডিভাইস স্থাপনে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতি কেন্দ্রে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে-এমন আশ্বাসে উপজেলা কার্যালয়ে শিক্ষকদের ডাকা হয়। তবে টাকা না দিয়ে ‘প্রাপ্তি স্বীকার’ রসিদে শিক্ষকদের দিয়ে সই করিয়ে নিয়েছেন ইউএনও।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ৬৯টি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা ও আনুষঙ্গিক ডিভাইস স্থাপনের জন্য বরাদ্দ ছিল ২২ লাখ টাকা। সরকারি ভ্যাট-ট্যাক্স বাদ দিয়ে প্রকৃত অর্থ দাঁড়ায় প্রায় ১৯ লাখ টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই অর্থে সর্বোচ্চ ৫৫টি কেন্দ্রের ব্যয় নির্বাহ সম্ভব। এ অবস্থায় বাকি কেন্দ্রগুলোতে কীভাবে ক্যামেরা স্থাপন করা হলো এবং শিক্ষকদের দিয়ে কেন অর্থ ব্যয় করানো হলো-তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সেই প্রক্রিয়ায় শিক্ষকদের ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। ইতোমধ্যে শিক্ষক মহলে বিষয়টি নিয়ে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। তারা দ্রুত অর্থ পরিশোধ এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন।
শিক্ষকদের দাবি, প্রশাসনের চাপে দ্রুত কাজ শেষ করতে হয়েছে। নির্বাচনকালীন নিরাপত্তার স্বার্থে তারা আপত্তি তোলেননি। কিন্তু টাকা না পেয়ে এখন তারা আর্থিক সংকটে পড়েছেন। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া জটিলতায় পড়ে তারা আদৌ টাকা ফেরত পাবেন কিনা তা অনিশ্চিত।
মাইলবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহাবুল ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচন সামনে রেখে দ্রুত ক্যামেরা স্থাপন করতে তাগাদা দেওয়া হয়। টাকা পরে পরিশোধ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। এজন্য ইউএনও অফিসে ডাকা হয় সব স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের। কিন্তু টাকা না দিয়ে উল্টো ‘প্রাপ্তি স্বীকার’ রসিদে সই নিয়ে বিদায় দেওয়া হয়েছে।’
পিরগাছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মুজিবুর রহমান বলেন,‘নির্বাচনের স্বচ্ছতার জন্য কাজ করেছি। কিন্তু এখন নিজের পকেটের টাকা ফেরত পাবো কিনা সেই চিন্তায় আছি।’
নেপা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘ধারদেনা করে ক্যামেরা লাগিয়েছি। এখনো টাকার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমরা সরকারি কর্মচারী হয়েও এভাবে অনিশ্চয়তায় আছি।’
এ বিষয়ে মহেশপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ইউএনও খাদিজা আক্তারের নির্দেশনা মোতাবেক শিক্ষকরা ক্যামেরা স্থাপন করেছে। ইউএনও’র সাথে কথা হয়েছে-ক্যামেরা স্থাপন বাবদ শিক্ষকরা যে টাকা খরচ করেছেন, তা বিভিন্ন খাত থেকে পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করা হবে। বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। তবে কবে নাগাদ টাকা পরিশোধ হবে-এ বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। শিক্ষকদের ব্যক্তিগত টাকায় ক্যামেরা স্থাপনের নিয়ম আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মহেশপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা আক্তার বলেন, ‘১১২ টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ৬৯টি কেন্দ্রে সরকারিভাবে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের নির্দেশনা ছিল। বাকি ৪৩টি কেন্দ্র অরক্ষিত থাকার কারণে স্ব-উদ্যেগে শিক্ষকদের নিজের টাকায় ক্যামেরা স্থাপনের নির্দেশ দিই। সেই মোতাবেক তারা ক্যামেরা গুলো স্থাপন করে। কিন্তু দু:খের বিষয় হলো-৪৩টি কেন্দ্রের কোন বরাদ্দ না আসায় প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে আলোচনা করে স্কুলের স্লিপ ফান্ড থেকে সমন্বয় করার জন্য পরামর্শ দিয়েছি। তবে আপাতত প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে ১০ হাজার ও মাধ্যমিক ও মাদ্রাসা গুলোতে ৫ হাজার টাকা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। এসময় প্রত্যেক স্কুল প্রধানদের কাছ থেকে ‘প্রাপ্তি স্বীকার’ রসিদে স্বাক্ষর করে রেখেছি, কিন্তু এখনও টাকা দিতে পারিনি। পরবর্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে আলোচনা করে পর্যায়ক্রমে তাদের টাকা পরিশোধ করার ব্যবস্থা করা হবে।
শহিদুল ইসলাম
মহেশপুর ঝিনাইদহ।।

Leave a Reply