রাজশাহী থেকে মোঃ হায়দার আলীঃ রাজশাহী গোদাগাড়ী পৌরসভার ২ নং ওয়ার্ডে মহিশালবাড়ী গরুর হাটে পাশে কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আজ শুক্রবার জুম্মা নামাজে খুদবা প্রদান করেছেন জামায়াতের নায়েবী আমির রাজশাহী ১ এর নব নির্বাচিত এমপি অধ্যাপক মোঃ মুজিবুর রাহমান।
কুরআন, হাদীসের আলোকে সুন্দর, গঠনমূলক, বাস্তবধর্মী বক্তব্য প্রদান করেন। উপস্থিত মুসাল্লীগন মনোযোগসহকারে তার বক্তব্য শুনেন। তিনি বলেন, পরিবার, সমাজ, দেশে অন্যায় ও দুর্নীতি প্রতিরোধে ইসলাম অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে, একে ঈমানি দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করেছে। রাসূল (সা.) বলেছেন, কেউ অন্যায় দেখলে যেন তা হাত (ক্ষমতা/শক্তি) দিয়ে প্রতিরোধ করে, না পারলে মুখ (প্রতিবাদ) দিয়ে, আর তাও না পারলে অন্তর (ঘৃণা) দিয়ে প্রতিহত করে। ঘুষ-দুর্নীতি নিষিদ্ধ এবং অন্যায়ের প্রতিরোধে সোচ্চার থাকা জরুরি ।
সক্রিয় প্রতিরোধ: সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যায় বা দুর্নীতি হাত বা শক্তি দিয়ে, এরপর মুখ বা লেখনীর মাধ্যমে প্রতিরোধ করতে হবে ।
হৃদয় থেকে ঘৃণা করা: যদি সরাসরি প্রতিরোধ সম্ভব না হয়, তবে অন্তর থেকে অন্যায়কে ঘৃণা করতে হবে এবং তা অন্যায় বলে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে হবে ।
দুর্নীতিবাজদের বর্জন: দুর্নীতিবাজদের কোনোভাবে সহযোগিতা করা বা সমর্থন দেওয়া যাবে না, এমনকি তাদের প্রতি ঝোঁকাও অনুচিত
সামাজিক দায়িত্ব: দুর্নীতি প্রতিরোধে সমাজ ও প্রশাসনের যোগ্য ও সৎ লোকদের পদায়ন করা এবং দুর্নীতির খবর কর্তৃপক্ষকে জানানো জরুরি ।
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা: ব্যক্তিগত ঘৃণা-বিদ্বেষ ভুলে ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখা এবং সমাজে সততা ও আমানতদারি প্রতিষ্ঠা করা ইসলামের মূল লক্ষ্য।
একটি জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো দুর্নীতি। এই ব্যাধি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিই বয়ে আনে না, বরং একটি রাষ্ট্রের নৈতিক কাঠামোকেও ভেতর থেকে ভেঙে দেয়।
মানুষকে নামাজ পাড়ার কথা বললে, পেটে ভাত নেই, থাকার জায়গা নেই, চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই, বস্ত্র কেনার টাকা নেই, কাজ নেই। এর কেউ ব্যবস্থা করার কথা বলেন না।
বিগত সরকার ২৮ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন, চুরি করেছেন, লুটপাট করেছেন, যা দিয়ে দেশের ৪ টি বছরের বাজেট হতো। বাজেট করতে নতুন করে কোন টাকা লাগতো না। এ টাকা ফেরত আন্তে পারলে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিভুক্ত করা সম্ভব হতো। দেশের উন্নয়ন করা যেত।
পরিবারের কর্তা, মেম্বার, চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর, মেয়র, উপজেলার চেয়ারম্যান, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান, এমপি, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপ্রতি, সমাজের নেতা, রাজনৈতিক নেতা সবাইকে আল্লাহর নিকট দায়বদ্ধ থাকতে হবে। সবাই যদি নামাজ পড়েন, যাকাত দেন, সামাজে চান্দাবাজি, দুর্নীতি, মাদক বন্ধ করার চেষ্টা করেন। চরিত্র ভালভাবে গড়ার চেষ্টা করেন তবে দেশের সকল মানুষ শান্তিতে থাকবে ইনসাল্লাহ।
ইসলামের দৃষ্টিতে চান্দাবাজ, টেন্ডারবাজি চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, সুদ, ঘুষ, জুয়া তথা যেকোনো হারাম পন্থা অবলম্বন, ক্ষমতা ও পেশিশক্তির অপব্যবহার, স্বেচ্ছাচারিতা, প্রতারণা, আইনের অসৎ ব্যবহার ইত্যাদির মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিল এবং দেশ, জাতি ও সাধারণ নাগরিকের অধিকার ও স্বার্থ হরণ করার নাম দুর্নীতি। ইসলাম অপরাধী, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে শাস্তি দিতে স্বচ্ছ আইন এবং তা দ্রুত কার্যকর করার বিধান প্রণয়ন করেছে। এ ছাড়া ইসলামে অপরাধ ও দন্ড-বিধি মওকুফ করার অধিকার রাষ্ট্রপ্রধানকেও দেওয়া হয়নি। কারণ এতে অপরাধীদের আরও বড় অপকর্ম করার সুযোগ করে দেওয়া হয়। এ জন্য মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আমার মেয়ে ফাতেমা চুরি করলেও আমি তার হাত কেটে দেওয়ার নির্দেশ দেব।’ (বুখারি)।
অসৎ ও হারাম উপায়ে উপার্জনের প্রবণতা থেকেই মানুষ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়। দুর্নীতি দমনের মূলনীতি হিসেবে ইসলাম হালাল-হারামের পার্থক্য স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে। সেই সঙ্গে হালালের উপকারিতা এবং হারামের অপকারিতা স্পষ্ট করে দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মানুষ, পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তু ভক্ষণ করো। আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। সে নিঃসন্দেহে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা বাকারা : ১৬৮)। মহানবী (সা.) হারাম উপার্জনে উম্মতকে নিরুৎসাহিত করেছেন। তিনি এরশাদ করেন, ‘হারাম খাদ্য ও পানীয়ে বর্ধিত দেহ জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (মিশকাত) অন্য হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি ১০ দিরহামে একটি কাপড় পরিধান করে, যার মধ্যে ১ দিরহাম হারাম থাকে, তার পরিধানে ওই কাপড় থাকা অবস্থায় আল্লাহ তাআলা তার নামাজ কবুল করেন না।’ (মুসনাদে আহমাদ)।
আল্লাহর ভয় ও নৈতিকতার অনুশীলন : দুনিয়ায় অপরাধের শাস্তি হোক বা না হোক, আখিরাতে সব অপরাধের বিচার হবে। দুনিয়ায় মানুষের চোখ ফাঁকি দেওয়া গেলেও আখিরাতে আল্লাহর দরবারে ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগই থাকবে না; বরং সব কর্মকা-ের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হবে। সেখানে কোনো বিষয়ে দুর্নীতি, ব্যক্তি বা জাতির হক আত্মসাৎ প্রমাণিত হলে তার জবাবদিহি করতে হবে এবং পরিণামে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। তা থেকে বাঁচার কোনো উপায় থাকবে না। সেদিন হাত, পা ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অপরাধীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন, ‘আজ আমি তাদের মুখে মোহর এঁটে দেব, তাদের হাত আমার সঙ্গে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে।’ (সুরা ইয়াসিন: ৬৫)।
ঈমানের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হচ্ছে নামায। আল্লাহ তাঁর পবিত্র কালামে বিভিন্নভাবে নামাযের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন এবং বিচিত্ররূপে নামাযের প্রতি আহ্বান করেছেন।
কোনো বিষয়ে গুরুত্বারোপের একটি সহজ-সরল পদ্ধতি হল সে বিষয়টির আদেশ করা। নামাযের উপর গুরুত্বারোপের জন্য এ পদ্ধতিটি কুরআনে অনেক ব্যবহার করা হয়েছে। কুরআনে নামাযের সুস্পষ্ট আদেশ করা হয়েছে এবং বারবার বিভিন্নভাবে করা হয়েছে।
যেমন আল্লাহ বলেন-এবং তোমরা নামায কায়েম কর, যাকাত আদায় কর এবং রুকূকারীদের সঙ্গে রুকূ কর।-সূরা বাকারা (২)
অন্যত্র বলেছেন-এবং তোমরা আল্লাহর পথে সাধনা কর, যেমন সাধনা করা উচিত। তিনি তোমাদের মনোনীত করেছেন এবং দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের প্রতি কোনো সংকীর্ণতা আরোপ করেননি। তোমাদের পিতা ইবরাহীমের দ্বীন (-কে আঁকড়ে ধর)। তিনিই তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলিম, পূর্বেও এবং এ কিতাবেও, যাতে রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষী হয় আর তোমরা (অন্যান্য) মানুষের জন্য সাক্ষী হও। সুতরাং তোমরা নামায কায়েম কর, যাকাত আদায় কর এবং আল্লাহকে মজবুতভাবে ধর। তিনিই তোমাদের অভিভাবক। তিনি কত উত্তম অভিভাবক এবং কত উত্তম সাহায্যকারী।-সূরা হজ্ব (২২) :
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে একটি জাকাত। আরবি জাকাত শব্দের অর্থ পবিত্রতা ও বৃদ্ধি। কোনো মুসলমানের ধনসম্পদ থেকে তার নিজের ও পরিবারের সারা বছরের প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর পর নির্ধারিত পরিমাণ ধনসম্পদ তার মালিকানায় থাকার এক বছর পূর্ণ হলে সেই সম্পদের নির্দিষ্ট একটি পরিমাণ শরিয়া-নির্ধারিত খাতগুলোয় প্রদান করাকে জাকাত বলা হয়।
ইসলামে নামাজের পরই জাকাতের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনের বহু স্থানে নামাজের পাশাপাশি জাকাত আদায়ের কথা বলা হয়েছে। জাকাত দাতার মনকে ধনসম্পদের প্রতি লোভ থেকে মুক্ত ও পবিত্র করে। ধনীদের ধনসম্পদে যে দরিদ্রদের অধিকার রয়েছে, এই সত্যকেও তা প্রতিষ্ঠিত করে।
পবিত্র কোরআনের সুরা জারিয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর তাদের (সম্পদশালীদের) ধনসম্পদে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের হক রয়েছে।’ এভাবে জাকাতের মাধ্যমে সমর্থ ব্যক্তিদের সম্পদের কিছু অংশ ব্যয়ের ফলে তাদের অবশিষ্ট ধনসম্পদ পবিত্র হয়।
সুরা তওবায় বলা হয়েছে, ‘তুমি ওদের ধনসম্পদ থেকে সদকা আদায় করো। এর মাধ্যমে তুমি তাদের পবিত্র করে দেবে।’ জাকাত শব্দের আরেক অর্থ বৃদ্ধি। বস্তুত জাকাত দিলে ধনসম্পদ বাড়ে।
সুরা তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে যে ফকির, মিসকিন, জাকাত আদায় কর্মী, নও মুসলিম ও অনুরাগী, দাস-দাসী, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, মুজাহিদ ও বিপদগ্রস্ত মুসাফিরকে জাকাত দিতে হবে।
কোরআনে ইসলামের তিনটি স্তম্ভ- ঈমান বিশ্বাস নামাজ ও যাকাতের কথা বার বার একসাথে বলা হয়েছে। নামাজ এবং যাকাতের কথা কোরআনের ১৬টি সূরায় ২৮ বার একসাথে বলা হয়েছে।
এবং এইজন্যে হিজরি অষ্টম শতকের বিখ্যাত আলেম ইমাম আল ইরাকী খুব সুন্দরভাবে বলেছেন- যারা ঈমান নামাজ এবং যাকাত এই তিনটি স্তম্ভের আন্তরিক যত্ন নেবে তারা রোজা ও হজ পালন করতে পারবেন অনায়াসে।
মোঃ হায়দার আলী
রাজশাহী।

Leave a Reply