আরিফ রববানী ময়মনসিংহ।। রাত পোহালেই আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরই মধ্যে ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়া) আসনটি জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতিতেও আলোচনার কেন্দ্রেবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই আসনটিতে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী সাবেক এমপি শামসুদ্দিন আহমেদ এর ভাতিজা আকতারুল আলম ফারুক ধানের শীষে প্রতীকে, জামায়াতে ইসলামী এর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী অধ্যক্ষ মু কামরুল হাসান মিলন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে, এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিস্কৃত জামায়াত নেতা অধ্যাপক জসিম উদ্দিন ও সাবেক এমপি শামসুদ্দিন আহমেদ এর স্ত্রী আকতার সুলতানা ফুটবল প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন। হাতপাখা নিয়ে মাঠে রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী নূরে আলম ছিদ্দিকি।
নির্বাচনের প্রাক্কালে ময়মনসিংহ-৬ আসনে চিত্র ছিল ভিন্ন। জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মাঠে ছিলেন সংগঠনের ময়মনসিংহ জেলা শাখার নায়েবে আমীর অধ্যক্ষ মু কামরুল হাসান মিলন। জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জোরালো প্রচারণার কারণে তাকে তখন এই আসনের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিলো। কিন্তু দলীয় সিদ্বান্তের বাইরে গিয়ে জামায়াতের সাবেক কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য অধ্যাপক জসিম উদ্দিন প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় নির্বাচনী সমীকরণ হঠাৎ করেই নতুন মোড় নেয়। এতে বিএনপি শিবির কিছুটা স্বস্তি পেলেও বিএনপি দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সাবেক এমপি শামসুদ্দিন আহমেদ এর স্ত্রী আকতার সুলতানা তার প্রার্থীতা প্রার্থীতা প্রত্যাহার না করায় মাঠ পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি বিএনপি মনোনীত প্রার্থী।
দুই দলের দুই স্বতন্ত প্রার্থী দলীয় প্রার্থীদের কাটা হয়ে দাড়িয়েছে। দুই দলের প্রার্থীরা ভোটারদের পছন্দমত না হওয়ায় এই সুযোগেই দৃশ্যপটে ক্রমশ সামনে আসতে শুরু করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী অধ্যাপক জসিম উদ্দিন ও আকতার সুলতানা। স্থানীয় জামায়াতের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত মুখ জসিম উদ্দিন। তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি মানুষের বিপদে আপদে পাশে থেকে নিজেকে জনগণের খুব ভালো বন্ধু হিসাবে পরিচিত করেছেন। জনপ্রতিনিধি না থেকেও দীর্ঘ সময়জুড়ে জনসেবা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক সমীকরণ বোঝার বাস্তব অভিজ্ঞতা তাকে অন্য প্রার্থীদের তুলনায় আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
অধ্যাপক জসিম উদ্দিনের পরিচয় শুধু একজন রাজনীতিক হিসেবেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ফুলবাড়িয়া আল হেরা একাডেমি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও আল মানার এতিমখানা ময়মনসিংহের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে শিক্ষাক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, চাঁদাবাজ ও দলবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, নিজ এলাকার মানুষের প্রতি নিরবচ্ছিন্ন সেবা এবং মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, স্কুল ও কলেজে তার স্বতঃস্ফূর্ত অনুদান ও অংশগ্রহণ তাকে এলাকায় ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা এনে দিয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোটের প্রার্থী মু কামরুল হাসান মিলন শেষ সময়ে এসে প্রভাব খাটিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী সমর্থকদের উপর হামলা, মানুষের সাথে আচার- আচরণ নিয়ে তার বদনাম ছড়ানোর ফলে তিনি তার ইমেজ ধরে রাখতে পারেননি। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ও আচার আচরণে তিনি তার ইমেজ হারিয়ে ফেলেছেন। স্থানীয় পর্যায়ে শোনা যাচ্ছে, ফুলবাড়িয়ায় জামায়াত বলতে অধ্যাপক জসিম উদ্দিনকে জানে উপজেলার মানুষ। উপজেলায় তিনিই জামায়াতে ইসলামীকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ত্যাগের মুল্যায়ন করা হয়নি অধ্যাপক জসিম উদ্দিনের প্রতি। ফলে জামায়াতে ইসলামীর অনেক দায়িত্বশীল সমর্থক ইতিমধ্যে নীরবে ও অনানুষ্ঠানিকভাবে জসিম উদ্দিন এর প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, আওয়ামীলীগ এবার নির্বাচনে অংশ না নিলেও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নিরাপত্তা ও পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় রেখে দলটির ঐতিহ্যবাহী ভোটব্যাংক কার্যত স্বতন্ত্র প্রার্থী জসিমের দিকেই ঝুঁকছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। এই সমর্থন নির্বাচনী অঙ্কে একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করতে পারে। বিএনপি প্রার্থী আকতারুল আলম ফারুক ধানের শীষের প্রচারণা নিঃসন্দেহে জোরালো। তবে তারই চাচী মরহুম সাবেক এমপি শামসুদ্দিন আহমেদ এর স্ত্রী আকতার সুলতানা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করায় বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ফারুক নতুন মুখ হওয়ায় তাকে বয়কট করে অনেক সিনিয়র নেতারা প্রকাশ্যে ও গোপনে আকতার সুলতানাকে সমর্থন করায় দলীয় প্রতীক ধানের শীষ নিয়েও বিপাকে পড়েছে বিএনপি মনোনীত নতুন প্রার্থী ফারুক। ৫ই আগস্টের পর এই দলের প্রতি মানুষের যে প্রবল আস্থা ছিলো তা ক্রমবর্ধমান হারে হ্রাস পেয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
জাতীয় পর্যায়ে বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোটের মধ্যকার সাংবিধানিক ভোটযুদ্ধের ফল যেমন ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত হবে, তেমনি ফুলবাড়িয়া আসনেও ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেবেন-দলীয় প্রতীকের রাজনীতি, না কি পরীক্ষিত জনপ্রতিনিধিত্ব ও স্থানীয় উন্নয়নের বাস্তব অভিজ্ঞতা। সব মিলিয়ে মাঠের বর্তমান পরিস্থিতি, নীরব সমর্থনের প্রবাহ, দীর্ঘদিনের জনসেবার রেকর্ড এবং বহুমাত্রিক গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় ময়মনসিংহ-৬ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী অধ্যাপক জসিম উদ্দিন ক্রমেই একজন শক্তিশালী ও সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন আর সাবেক এমপি শামসুদ্দিন আহমেদ এর স্ত্রী আকতার সুলতানা তার প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন এমনটিই ধারণা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

Leave a Reply