আলিফ হোসেন,তানোরঃ
রাজশাহী-১(তানোর-গোদাগাড়ী) আসন দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভিআইপি আসন হিসেবে পরিচিত। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সনাতন ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত রাজশাহী-১ আসন এটি শুধু একটি সংসদীয় আসন নয়, বরং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক শক্তি ও ভোট ব্যাংক। স্বাধীনতার পর থেকে এই আসনে আওয়ামী লীগের একটি নিদ্রিষ্ট ভোট ব্যাংক রয়েছে।
কিন্তু ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই ইতিহাসকে প্রথমবারের মতো বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় রাজশাহী-১ আসনকে এনে দিয়েছে এক ধরনের রাজনৈতিক শূন্যতা। সেই শূন্যতাই মাঠে এখন রূপ নিয়েছে দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।
রাজশাহী-১ আসনের তানোর উপজেলায় ২টি পৌরসভা ও ৭টি ইউনিয়ন এবং গোদাগাড়ী উপজেলায় রয়েছে ২টি পৌরসভা ও ৯টি ইউনিয়ন। তানোর উপজেলার আয়তন ২৯৫ দশমিক ৪০ বর্গ কিলোমিটার এবং গোদাগাড়ী উপজেলার আয়তন ৪৭৫ দশমিক ২৬ বর্গ কিলোমিটার।মোট আয়তন ৭৭০ দশমিক ৬৬ বর্গ কিলোমিটার। আয়তনের দিক দিয়ে সংসদীয় আসন হিসেবে দেশের ৮ম বড় এলাকা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৩৪ হাজার ৬৯৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৩ জন। মোট ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১৫৯টি। এর মধ্যে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ভোটার প্রায় ৮০ হাজার ও সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটারগণ আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে পরিচিত।দির্ঘদিন ধরে এই ভোটারদের বড় অংশ আওয়ামী লীগের প্রতি অনুগত ছিলেন। ফলে দলটি নির্বাচনে না থাকলেও তাদের ভোটাররা রাজনীতির বাইরে থাকবেন এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। মূল প্রশ্ন হলো এই ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক বিএনপি,জামায়াত
স্বতন্ত্র প্রার্থী নাকি বিভক্ত অবস্থায় থাকবে ?
বিএনপির প্রার্থী মেজর জেনারেল অবঃ শরিফ উদ্দিন এখানে সবচেয়ে সুসংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতিনিধিত্ব করছেন। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, মাঠপর্যায়ের সংগঠন এবং ধারাবাহিক গণসংযোগসহ সব মিলিয়ে দলীয় শক্তির দিক থেকে তিনি এগিয়ে। তবে এই আসনে বিএনপির মূল চ্যালেঞ্জ হলো ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগপন্থী ভোটারদের আস্থা অর্জন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি যদি এই ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে ‘ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার নিরাপত্তা ও আস্থা’ দিতে পারে, তাহলে ধানের শীষ বড় সুবিধা পেতে পারে। অন্যথায় দলীয় শক্তি থাকা সত্ত্বেও ভোট বিভাজনের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী, দলের নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান মূলত সাবেক এমপি হিসেবে পরিচিতি, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং উচ্চ শিক্ষিত ও সৎ নেতৃত্বের ভাবমূর্তিকে পুঁজি করে এগোচ্ছেন। এলাকায় তাঁর প্রভাব শক্ত হলেও এবার পুরো আসন জুড়ে সেই প্রভাব কতটা বিস্তৃত হবে সেটাই বড় প্রশ্ন।কারণ আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন
এবার একটি আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকলেও এবার সেই ভোট কোন প্রার্থীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে সেটা বলা দুরুহ।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই ভোট ছড়িয়ে না পড়ে একমুখী হয়, তাহলে বড় চমকের জন্ম দিতে পারে। এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় অজানা ভ্যারিয়েবল হলো সিদ্ধান্তহীন ভোটাররা। মাঠপর্যায়ের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, একটি বড় অংশ এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তাদের ভোট মূলত নির্ভর করবে নির্বাচনের পরিবেশ, ভোটকেন্দ্রের পরিস্থিতি এবং শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক বার্তার ওপর।
এবার রাজশাহী-১ আসনের নির্বাচন শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয় এটি একটি রাজনৈতিক রূপান্তরের পরীক্ষাগার। এখানে কে জিতবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এই জনপদের
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সনাতন ভোটাররা কোন রাজনৈতিক সমীকরণকে গ্রহণ করবেন সেটা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজশাহী-১ আসনে তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট দেখা যেতে পারে আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যগত ভোট বিএনপির দিকে গেলে শরিফ উদ্দিনের ও জামায়াতের দিকে গেলে অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের জয় নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।কিন্তু ভোট বিভক্ত হলে ভোটের সমীকরণ কি হবে বলা মুশকিল। আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটিতে ভোটাররা কোন পথে হাঁটছেন তা জাতীয় রাজনীতিতে একটি স্পষ্ট বার্তা দেবে। বিশেষ করে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পুনর্গঠন ও ভোটের আচরণ বিশ্লেষণে এই আসন একটি ‘কেস স্টাডি’ হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের অভিমত,
এবার আদর্শের ভোট না, পরিস্থিতির ভোট হবে।ফলে যেহেতু বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একটি দল, তাই আওয়ামী লীগ সমর্থিত ভোটররা হয়তো সেদিকেই ঝুঁকতে পারেন। কারণ আদর্শিক জায়গা থেকে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত পুরোপুরি বিপরীতমুখী। তাই তাদের প্রতি আওয়ামী লীগের সহানুভূতি কমই থাকবে। আবার যেহেতু ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগের পতন হয়েছে, তাই নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি), গণ-অধিকার পরিষদ বিবেচ্য না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি আওয়ামী লীগ সমর্থক ও ভোটারদের কাছে।
অন্যদিকে অভিজ্ঞ মহলের অভিমত আওয়ামী লীগের বড় একটি ভোট ব্যাংক সব সময়ই ছিল। গত বছর গণঅভ্যুত্থানের পর কিছুটা হয়তো কমেছে। আগামী নির্বাচনে দলটির ভোটার-সমর্থকেরা হয়তো ভোট দিতে যাবেন এবং আসন ভিত্তিক সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থীকেই ভোট দেবেন। যাঁদের ব্যবসা বাণিজ্য রয়েছে, যাঁদের সম্পদ রয়েছে, কেউ কেউ চাকরি ও কর্ম টেকাতে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী দলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করবেন, যেন আগামীতে টিকে থাকতে পারেন।এক্ষেত্রে তাদের প্রথম পচ্ছন্দ বিএনপি। কারণ দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেভাবেই নির্বাচন হোক বিএনপি একক সংখ্যগরিষ্ঠতা পাবেন এটা প্রায় নিশ্চিত। আবার মেজর জেনারেল অবঃ শরিফ উদ্দিন বিজয়ী হলে তার মন্ত্রী হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।এবিবেচনায় সরকার গঠন করবে বিএনপি, এখানকার এমপি হবেন মন্ত্রী,তাহলে অহেতুক বিএনপির বিপক্ষে ভোট দিয়ে ভোট নস্ট ও সরকারি দলের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি করার মতো ঝুঁকি নিবেন না আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটারগণ।
রাজশাহী-১ আওয়ামী শূ-ন্যতায় কার ঘরে যাবে ঐতিহ্যগত ভোট ?

Leave a Reply