রাজশাহী ১ আসনে বাঘে সিংহের লড়াই বেশ জমে উঠেছে। বিএনপি, জামায়াত কেউ কাকে ছাড় দিতে নারাজ

রাজশাহী থেকে মোঃ হায়দার আলীঃ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভিআইপি আসন হিসেবে খ্যাত রাজশাহী ১ আসনে প্রতীক বরাদ্দের পর বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এবি পাটির প্রার্থীদের মাঠ পর্যায়ে গণসংযোগ, পথসভার, মিনি টুর্নামেন্ট, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, মসজিদের অনুষ্ঠান, মাহাফিলের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মাঝে নির্বাচনী আমেজ সৃষ্টি হয়েছে। মাঠে চলছে ভোটের হিসাব-নিকাশ। চলছে সমীকরণ, দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করাসহ প্রার্থীরা নানা কৌশল অবলম্বন করছেন। চায়ের কাপে ঝড় তুলছেন নিজ নিজ প্রার্থীর সমর্থনে নেতা, কর্মী সমর্থকগন।

রাজশাহী ১ আসনটি উপজেলা গোদাগাড়ী ও তানোর নিয়ে গঠিত। রাজশাহী – ১ (গোদাগাড়ী – তানোর) আসনটির মোট আয়তন ৭৬৭.৫৩ বর্গ কিলোমিটার।

রাজশাহী-১ আসনের ২টি উপজেলা, ৪টি পৌরসভা ও ১৬টি ইউনিয়নে মোট ভোটার সংখ্যা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ৫২ রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ জন। এর মধ্যে গোদাগাড়ী উপজেলায় ২ লাখ ৯৬ হাজার ৯১০ জন। আর তানোর উপজেলায় ১ লাখ ৭১ হাজার ৮৭০ জন। এ আসনের কিংমেকার’ হতে পারেন নারীরাই। বিপুল সংখ্যক ভোটারের মধ্যে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এক বড় অংশের বসবাস রয়েছে এ আসনে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা খুবই সাধারণ জীবন যাপন করে থাকেন। মাঠে ঘাটে কৃষি কর্মে তাদের সময় কাটে অধিক। তাদের বসে আনতেও চলছে নানা তৎপরতা। বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন, শীর্ষ পর্যায়ের হেভিওয়েট বিএনপির এবং জামায়াতের নায়েবী আমির প্রার্থীর মধ্যে তীব্র লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।

চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভোটারদের ধারণা-এ আসনে মূলত দ্বিমুখী হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। এ আসনে ১৯৮৬ সালের ৭ মে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হয়ে ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান নায়েবে আমীর অধ্যাপক মো. মুজিবুর রহমান। তিনি এবারেও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। তার বাড়ি গোদাগাড়ী উপজেলার মহিশালবাড়ী। পিতার নাম সেরাজুল ইসলাম। অপরদিকে, বরেন্দ্র বহুমূখি উন্নয়ন প্রকল্পের কর্ণধর, অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব মরহুম ড. আসাদুজ্জামান ও ডাক ও টেলিযোগাযোগ সাবেক মন্ত্রী মরহুম ব্যারিস্টার আমিনুল হকের সহোদর ভাই ও মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল (অব.) মো. শরিফ উদ্দিন নির্বাচন করছেন ধানের শীষ প্রতীকে। কিন্তু তিনি এর আগে কোন এমপি নির্বাচনে অংশ নেননি। তার বাড়ি গোদাগাড়ীর কেল্লাবাবুইপাড়া গ্রামে। তার পিতার নাম ফহিম উদ্দীন বিশ্বাস। কিন্তু তানোর উপজেলা থেকে এবারে এ আসনে কোন এমপি প্রার্থী দাঁড়াননি। এ উপজেলায় কোন প্রার্থী না থাকায় বড় ফ্যাক্টর এ উপজেলার ভোটারগণ।

এছাড়াও এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন- গণঅধিকার পরিষদের মনোনীত প্রার্থী মির মো. শাহজাহান। তার পিতার নাম মির মো. আজাহার। তিনি ট্রাক প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। বাড়ি রাজশাহী নগরীর বোয়ালিয়া থানাধীন পদ্মা আবাসিক এলাকায়। অপরদিকে, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) মনোনীত প্রার্থী মো. আব্দুর রহমান। তিনি ঈগল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী করছেন। তার বাড়ি গোদাগাড়ী উপজেলার সারাংপুর রোডপাড়া শ্যামপুর এলাকায়। তথ্যানুসন্ধ্যানে জানা গেছে, ২০০৮ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ আসনটি নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দখলে থাকলেও এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ২০০৮ এর পূর্বে বিএনপি তথা মরহুম ব্যারিষ্টার আমিনুল হকের দখলে ছিল। এখন দলীয় সমীকরণ বদলেছে, ভোটে আ.লীগ প্রার্থীর অংশগ্রহণ না থাকলেও মাঠে ফিরেছে প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তাপ। স্থানীয় ভোটারদের মতে, এবারের লড়াই মূলত বিএনপির প্রার্থী মেজর জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত মো. শরিফ উদ্দিন ও জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক মো. মুজিবুর রহমানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। তাদের বাড়ি একই উপজেলার গোদাগাড়ীতে। বিশেষ করে এ দুই প্রার্থীর মধ্যে বিপুল সংখ্যক ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ায় প্রার্থীদের মাঝে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এদিক থেকে প্রচার-প্রচারণায় এগিয়ে রয়েছেন বিএনপি এবং জামায়াতও প্রচারণায় পিছিয়ে নেই। জামায়ের প্রার্থী অভিজ্ঞ একবার নির্বাচন করে এমপি। নির্বাচিত হয়েছিলেন।

এদিকে ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমিনুল হক রাজশাহী-১ আসন থেকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে একদলীয় নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, ১৯৯৬ সালের সপ্তম এবং ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠনকালে তিনি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। সেইসাথে তিনি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ছিলেন।

কিন্তু শরিফ উদ্দিন মরহুম ড. আসাদুজ্জামান ও ব্যারিস্টার আমিনুল হকের সহোদর ভাই হবার সুবাদে তাদের নিজস্ব ভোটব্যাংক ও বিএনপির নীরব সমর্থন রয়েছে বলে আলোচনা চলছে। অন্যদিকে, জামায়াত প্রার্থী অধ্যাপক মো. মুজিবুর রহমান দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে ভিন্ন কৌশলে এগোচ্ছেন। নারী কর্মীদের সম্পৃক্ত করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সংগঠিত প্রচারণা চালাচ্ছেন তিনি ও তার কর্মী সমর্থকরা। আর নিষিদ্ধ আ.লীগের ভোটার ও কর্মী সমর্থকরা নীরবে গোপনে যে দলের প্রার্থীর দিকে যাবে তিনি বেশ এগিয়ে যাবেন।
তবে, গণঅধিকার পরিষদের মনোনীত প্রার্থী মির মো. শাহজাহান ও এবি পার্টির প্রার্থী মো. আব্দুর রহমান তাদের নির্বাচনী প্রচার প্রচারণায় এখনো এখনও পিছিয়ে রয়েছেন। এছাড়াও তারা বড় কোনো প্রভাব ফেলতে পারবেন না বলেই অধিকাংশ ভোটারের অভিমত। নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ভোটারদের মাঝে উত্তাপ ততই বাড়ছে। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটবে ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালটের রায়ে। এখন শুধু অপেক্ষার পালা রাজশাহী-১ আসনে এমপি হিসেবে ভোটাররা কাকে বেছে নেন সেটায় দেখার বিষয়।

মোঃ হায়দার আলী
রাজশাহী।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *