আলিফ হোসেন,তানোরঃ
দীর্ঘ প্রায় ২২ বছর পর রাজশাহী সরকারি মাদরাসা মাঠে বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ভোটযুদ্ধে অংশ নিতে যাওয়া রাজশাহী জেলার ছয়জন প্রার্থীকে তিনি সকলের সামনে পরিচয় করিয়ে দেন। প্রত্যেকের হাতে তিনি তুলে দেন ধানের শীষের একগুচ্ছ রেপলিকা। লাখো নেতাকর্মী আর সমর্থকদের সামনে তিনি একে এক পরিচয় করিয়ে দেন প্রার্থীদের। উক্ত অনুষ্ঠানে রাজশাহী জেলার ছয় প্রার্থী ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন মহানগর ও জেলা বিএনপির নেতৃবৃৃন্দ।
রাজশাহী মহানগর বিএনপি’র সভাপতি মামুনুর রশীদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন রাজশাহী মহানগর বিএনপির সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন। এই জনসভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সনের সাবেক সামরিক সচিব ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য রাজশাহী-১ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মেজর জেনারেল অবঃ শরিফ উদ্দিন, রাজশাহী-২ আসনে বিএনপি প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনু,বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ত্রাণ ও পুর্ণবাসন বিয়য়ক সহ-সম্পাদক এবং রাজশাহী-৩ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এ্যাডঃ শফিকুল হক মিলন, বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (রাজশাহী বিভাগ) সৈয়দ শাহীন শওকত, রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশীদ মামুন ও সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটনসহ মহানগর ও জেলার অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
জানা গেছে, বৃহস্পতিবার দুপুরে ৫৪ তারেক রহমান তার স্ত্রী জুবাইদা রহমানকে নিয়ে মঞ্চে ওঠেন। এর আগে তিনি শাহ মখদুম (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন। তার আগে তারেক রহমান রাজশাহী বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখান থেকে তিনি লাল-সবুজ রঙের একটি বাসে জনসভা স্থলে যান।এসময় দলীয় নেতা-কর্মীরা তাকে স্বাগত জানাতে রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অনেক স্থানীয় বাসিন্দা বিএনপি প্রধানকে এক নজর দেখার জন্য বাড়ির ছাদে উঠে অবস্থান নেন। পথে তারেক রহমানের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছিল।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান পদ্মা নদীর ওপর উজানে ভারতের নির্মিত ফারাক্কা ব্যারাজের বিপরীতে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এই প্রতিশ্রুতি দেন। দলের প্রধান হিসেবে এটিই তারেক রহমানের প্রথম রাজশাহী সফর। এর আগে ২০০৪ সালে তিনি রাজশাহী এসেছিলেন। রাজশাহীতে তারেক রহমানের আগমনকে কেন্দ্র করে বিরাজ করেছে উৎসবমুখর পরিবেশ। ব্যানার-ফেস্টুন, স্লোগান আর উচ্ছ্বাসে মুখর পুরো এলাকা। প্রিয় নেতাকে একনজর দেখতে সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে জড়ো হয়েছেন লাখো নেতা-কর্মী। নগরীর বিনোদপুর, তালাইমারি, আলুপট্টি, সাহেববাজার, সিএনবি এলাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় সরেজমিনে দেখা গেছে, বিভিন্ন ইউনিটের নেতা-কর্মীরা ছোট ছোট মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে জড়ো হচ্ছেন। তাঁদের হাতে বিভিন্ন রঙের ক্যাপ, টি-শার্ট, দলীয় ব্যানার, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড ও পতাকা রয়েছে। ধানের শীষের স্লোগান দিচ্ছেন কর্মী-সমর্থকেরা। আশপাশের উপজেলার কর্মী-সমর্থকেরা আসছেন বাস বা ট্রাকে চেপে। সমাবেশে রাজশাহী ছাড়াও নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নেতা-কর্মীরাও এসেছেন। রাজশাহীর জনসভা শেষ করে তারেক রহমান নওগাঁর পথে রওনা দেন। সন্ধ্যায় নওগাঁর এটিএম মাঠে জনসভায় যোগ দিয়ে বক্তব্য দেবেন তারেক রহমান। নওগাঁ থেকে তিনি যাবেন বগুড়া। এরপর রাতে বগুড়ার আলতাফুন্নেসা মাঠে আরও একটি জনসভায় যোগ দেবেন বিএনপি চেয়ারম্যান। নওগাঁর জনসভায় জয়পুরহাটের নেতাকর্মীরা অংশ নেবেন। আর বগুড়ার জনসভায় যাবেন পাবনা ও সিরাজগঞ্জের নেতাকর্মীরা
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দল ক্ষমতায় এলে রাজশাহী অঞ্চলের উন্নয়নকাজ, পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ ও বরেন্দ্র প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। দলীয় নির্বাচনি জনসভায় বক্তৃতা করে তিনি শিক্ষানগরী, কৃষি ও কর্মসংস্থান, আইটি পার্ক সচলকরণ ও স্বাস্থ্যসেবা প্রসঙ্গে বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরেন।তিনি বলেন, তিনি প্রায় ২২ বছর পরে রাজশাহীতে জনসমাগমে অংশ নিচ্ছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে এলাকার মানুষের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক অনুভব করেন। জনসভায় তিনি বরেন্দ্র প্রকল্পের পুনরুজ্জীবন, খালগুলো খনন ও পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেন। বক্তৃতায় তিনি দাবি করেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময় বরেন্দ্র প্রকল্প সক্রিয় ছিল, যা খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করতে সহায়তা করেছিল।তিনি বলেন, আমরা বরেন্দ্র প্রকল্পকে পুনরায় চালু করতে চাই এবং খালগুলো খনন করতে চাই; পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণে কাজ শুরু করতে চাই। তিনি বলেন, এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের মানুষের উপকার হবে এবং কৃষি উৎপাদন বাড়বে।তিনি আরো বলেন, শিক্ষানগরী নামে পরিচিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও আইটি পার্কের সম্ভাবনা এখনও কাজে না লাগানোর দিক নিয়ে উদ্বেগ ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, আইটি পার্ককে কার্যকর করতে ও তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে প্রফেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।স্বাস্থ্যসেবায় উন্নয়ন নিয়ে তিনি বলেন, রাজশাহীতে একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে মানুষের চিকিৎসা সুবিধা বাড়াতে পরামর্শ চলছে, যাতে বাইরে চিকিৎসার জন্য যাওয়া কমে ও বৈদেশিক মুদ্রা দেশের মধ্যে থাকে।কৃষি-সম্পর্কিত পরিকল্পনায় তিনি ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষি কার্ড বিতরণ, কপ্তি ঋণসহ সার ও বীজ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি ঘোষণা করেন, নির্বাচনের পর ধানের শীষ বিজয়ী সরকার গঠন হলে ১০ হাজার টাকার ক্ষুদ্র কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হবে।দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গণতন্ত্র রক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও তিনি বহুক্ষণ আলোচনায় করেন। তিনি ১২ ফেব্রæয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের গণতান্ত্রিক অধিকার বাস্তবায়ন দাবি করেন এবং জনগণকে সতর্ক থাকার আহবান জানান।সভায় তিনি সামাজিক ঐক্য, আইনশৃঙ্খলা, মৌলিক উন্নয়ন ও শান্তির ওপর জোর দিয়ে বলেন, গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত হলে জনগণের কাজগুলো বাস্তবায়িত হবে।অনুষ্ঠানে কৃষকদের, আইটি কর্মীদের, নারীর ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষি-সম্পর্কিত উদ্যোগসহ বহু উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন বক্তা। তিনি বরেন্দ্র প্রকল্প, পদ্মা ব্যারেজ, আইটি পার্ক ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাতে পরিকল্পনা তুলে ধরেন।তারেক রহমান তার বক্তব্যে নির্বাচনি করণীয় হিসেবে ঘোষণা করেছেন, বরেন্দ্র প্রকল্প পুনরুজ্জীবন ও খাল খনন, পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণে উদ্যোগ, রাজশাহীর আইটি পার্ক সচলকরণ ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন, ফ্যামিলি ও কৃষি কার্ড বিতরণ, ক্ষুদ্র কৃষি ঋণ মওকুফসহ কৃষি সহায়তা, গণতন্ত্র রক্ষা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রুটিন।বক্তব্য শেষে তিনি জনগণের কাছে কাজ করব, সবার আগে বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ জিন্দাবাদ স্লোগান দেন।
ফারাক্কার বিপরীতে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের প্র-তিশ্রুতি দিলেন তারেক রহমান

Leave a Reply