তরিকুল ইসলাম তরুণ, কুমিল্লা প্রতিনিধি।
কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জেঁকে বসেছে তীব্র শীত। উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে বয়ে আসা হিমেল হাওয়া আর ঘন কুয়াশার চাদরে ভোরের সূর্য যেন প্রতিদিনই হারিয়ে যাচ্ছে। হাড়কাঁপানো এই ঠান্ডায় স্থবির হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জনজীবন। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ছিন্নমূল মানুষ, দিনমজুর ও খেটে খাওয়া নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই দিনে বৃহত্তর কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে তাপমাত্রা নেমে এসেছে ৯ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা চলতি শীত মৌসুমে এ অঞ্চলের সর্বনিম্ন।
ঘন কুয়াশা ও উত্তরের হিমেল বাতাসের কারণে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরসহ আশপাশের জেলাগুলোতে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি। ভোর থেকেই চারপাশ ঘন কুয়াশায় ঢেকে পড়ছে। এতে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, এমনকি দিনের বেলাতেও মহাসড়কে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলতে দেখা যাচ্ছে যানবাহন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টানা প্রায় ১৫ দিন ধরে সূর্যের দেখা মিলছে না। মাঝেমধ্যে দুপুরের পর সূর্য উঁকি দিলেও তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হচ্ছে না। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শীতের প্রকোপ আরও তীব্র আকার ধারণ করছে।
রিকশাচালক কবির হোসেন বলেন, গত ১৫ দিন ধরে সূর্যের দেখা নেই। আজ শীত আরও বেশি। সকালে রাস্তায় যাত্রীই পাওয়া যাচ্ছে না। কুয়াশার কারণে ১০–১৫ হাত দূরের কিছুই দেখা যায় না।
কুমিল্লা সদর উপজেলার বানাসুয়া মৌজার কোড়েরপাড় এলাকায় গোমতী নদীর দু’পাড়ের বেরিবাঁধ সড়ক সংলগ্ন অঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহের প্রকোপ আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম, সোহেল মিয়া ও শরিফুল ইসলাম জানান, ঘন কুয়াশা ও হিমেল হাওয়ায় শীত কয়েকগুণ বেড়েছে। ট্যাংকির পানিও বরফের মতো ঠান্ডা লাগছে। পেটের দায়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাজে বের হতে হচ্ছে।
কুমিল্লা জেলা কৃষি অফিস ও আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সকাল ৭টায় জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন তা ছিল ৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি। অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তাপমাত্রা আরও কমেছে। উত্তর দিক থেকে হিমেল হাওয়া অব্যাহত থাকলে শীতের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে তীব্র শীতে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। তারা গরম কাপড় ব্যবহারের পাশাপাশি শীতজনিত উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
শীতবস্ত্র বিতরণ নিয়েও দেখা দিয়েছে চরম সংকট। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ বছর কুমিল্লা জেলায় মাত্র ৫ হাজার কম্বল বরাদ্দ পাওয়া গেছে, যেখানে অন্যান্য বছর বরাদ্দ থাকত প্রায় এক লক্ষ। প্রাপ্ত কম্বলগুলো ইতোমধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় বিতরণ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ফলে গ্রামীণ ছিন্নমূল ও অসহায় মানুষ শীতবস্ত্রের আশায় প্রভাবশালীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, সরকারি বরাদ্দ খুবই সীমিত হওয়ায় সকল শীতার্ত মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। তিনি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
কুমিল্লা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, তাপমাত্রা এভাবে কমতে থাকলে আগামী কয়েক দিন শীতের প্রকোপ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে এবং উত্তরাঞ্চলের মতো পরিস্থিতি ধীরে ধীরে সারাদেশেই বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Leave a Reply