স্বরূপকাঠী সংবাদদাতা, (পিরোজপুর) প্রতিনিধি:
একটি জনপদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবিক চেতনার বিকাশে যে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় এক শতাব্দী ধরে আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলে আছে, তা হলো সরকারি স্বরূপকাঠী পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়। নানা ঘাত-প্রতিঘাত, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক আন্দোলন ও অর্থনৈতিক সংকট পেরিয়ে বিদ্যালয়টি আজও স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে—এটাই এর সবচেয়ে বড় সাফল্য।
১৯২৭ সালের ৪ জানুয়ারি স্বরূপকাঠীর বড় দত্ত বাড়িতে দত্ত মহাশয়দের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় এই বিদ্যাপীঠ।
প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত বিদ্যালয়টি সুনামের সঙ্গে পরিচালিত হলেও ১৯৪৬ সালের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ও ১৯৪৭ সালের দেশভাগের প্রভাবে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তৎকালীন পরিচালকদের অধিকাংশই ভারতে চলে গেলে ১৯৫২ সালে বিদ্যালয়টি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরিত্যক্ত অবস্থায় বিদ্যালয়ের আসবাবপত্র ও শিক্ষা উপকরণ লুটপাট হলেও দুটি ঘর কালের সাক্ষী হয়ে টিকে ছিল।
এই সংকটময় সময়ে স্বরূপকাঠীর বাবু সুরেন্দ্রনাথ কর্মকার স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অন্তত একটি ঘর রক্ষা করেন এবং সেখানে প্রাথমিকভাবে শিক্ষাকার্যক্রম চালু রাখেন। তবে প্রকৃত অর্থে বিদ্যালয়ের পুনর্জন্ম ঘটে ১৯৫৮-৫৯ সালে। গাভা হাই স্কুলের শিক্ষক জগন্নাথকাঠীর আব্দুল ওয়াহাব ও সুটিয়াকাঠীর আব্দুর রউফ বিদ্যালয়টি পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তাঁদের আহ্বানে সাড়া দেন শ্রদ্ধেয় ডা. আব্দুল লতিফসহ এলাকার বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি। শিক্ষক, যুবক, সরকারি কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ১৯৫৯ সালের ৪ জানুয়ারি মিলাদ মাহফিলের মাধ্যমে পুনরায় বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়।
প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষক ছিলেন মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ। বেঞ্চ-চেয়ার না থাকায় গাছতলায়, মাঠে, মণ্ডপে পাঠদান চলত—রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের আদলে। ছাত্রদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হতো স্থানীয় মানুষের বাড়িতে; ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। বিদ্যালয়ের ভিটা ভরাট, রাস্তা নির্মাণ, মাঠ উন্নয়ন—সবকিছুই হয়েছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর স্বেচ্ছাশ্রমে।
শিক্ষার মানে বিদ্যালয়টি শুরু থেকেই এগিয়ে ছিল। ১৯৬১ সালে বিশেষ অনুমোদনে প্রথমবার ৯ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। ১৯৬২ সালে ২৪ জনের মধ্যে ২২ জন এবং ১৯৬৩ সালে ১৬ জনের মধ্যে ১৪ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়ে বিদ্যালয়ের সুনাম ছড়িয়ে দেয়।
একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও ছিল উজ্জ্বল উপস্থিতি—বিতর্ক, নাটক, সংগীত, নৃত্য ও কবিতায় বিদ্যালয়টি ছিল থানার মধ্যে অগ্রগণ্য।
তবে সাফল্যের পথ মসৃণ ছিল না। পাশ্ববর্তী একটি বিদ্যালয়ের আপত্তি ও ধারাবাহিক তদন্তের কারণে দীর্ঘদিন সরকারি স্বীকৃতি পেতে বিলম্ব হয়। অবশেষে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লে. জেনারেল আজম খানের নির্দেশে বিদ্যালয়টি স্বীকৃতি লাভ করে। এই তদবিরে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন আব্দুল গণি সাহেবসহ একাধিক শুভানুধ্যায়ী।
১৯৬১ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে বিদ্যালয়ের ঘর বিধ্বস্ত হলেও স্বেচ্ছাশ্রমে তা পুনর্নির্মাণ করা হয়। ষাট ও সত্তরের দশকে ছয় দফা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল গৌরবের অধ্যায়। বহু শিক্ষার্থী মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশের স্বাধীনতায় অবদান রাখেন।
পরবর্তীকালে বিদ্যালয়টি মানবিক, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য শাখা চালু করে। ১৯৭৭ সালে এটি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং ২০১০ সালে পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসেবে পরিচিতি পায়। অবশেষে ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর জাতীয়করণের মাধ্যমে “সরকারি স্বরূপকাঠী পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়” নামে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে।
ফলাফলের দিক থেকেও বিদ্যালয়টি ধারাবাহিক সাফল্য ধরে রেখেছে। বোর্ড মেধাতালিকায় স্থান, বুয়েট, মেডিকেল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ভর্তি—সবই এই বিদ্যালয়ের গৌরবময় অর্জন। ক্রীড়া, স্কাউটিং ও সহপাঠক্রমিক কার্যক্রমে জাতীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ে অসংখ্য পুরস্কার অর্জিত হয়েছে।
২০২২ সালে নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নে দেশের ৬২টি পাইলট স্কুলের মধ্যে এই বিদ্যালয় স্থান পায়। একাধিক শিক্ষক জেলা পর্যায়ে মাস্টার ট্রেইনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আধুনিক শিক্ষা, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও সহপাঠক্রমিক কার্যক্রমে বিদ্যালয়টি এখনো অগ্রণী ভূমিকা রাখছে।
বর্তমানে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও বিদ্যালয়ের সভাপতি অমিত দত্তের তত্ত্বাবধানে শিক্ষা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান। নতুন গেট, শহীদ মিনার, অসমাপ্ত একাডেমিক ভবন ও মাঠ সম্প্রসারণসহ নানা উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রত্যাশা রয়েছে।
প্রায় এক শতাব্দীর পথচলায় সরকারি স্বরূপকাঠী পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি স্বরূপকাঠীর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মানুষের সম্মিলিত স্বপ্নের প্রতীক বিদ্যালয়টি,
আগামি বছর ২০২৭ সালে শতবর্ষে পদার্পণ করবে সে উপলক্ষে বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক, প্রতিষ্ঠাতা পরিবার শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিয়ে ঝাঁকজমকপূর্ণ ভাবে শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
আনোয়ার হোসেন।।

Leave a Reply